অন্যরকম নানা পাটেকর
অভিনয়ের পাশাপাশি ছিলেন শুটার, আয়ের ৯০ শতাংশই করতেন দান
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০৮-১০-২০২৬ ০৩:৫৮:৩২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৮-১০-২০২৬ ০৩:৫৮:৩২ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে নানা পাটেকর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে। অভিনয়ের পাশাপাশি স্পষ্টবাদিতা, সাদাসিধে জীবনযাপন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণেও আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তিনি। খ্যাতি ও অর্থের হাতছানি থাকলেও বিলাসী জীবনযাপনের প্রতি কখনোই খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না এই অভিনেতা।
চলচ্চিত্র অভিনেতা বললেই সাধারণত লাইট-ক্যামেরায় শ্যুটিংয়ের কথাই মনে আসে। কিন্তু নানা পাটেকরের ক্ষেত্রে শুটিংয়ের আরেকটি পরিচয়ও ছিল। জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই অভিনেতা ছিলেন একজন পেশাদার শুটারও।
কয়েক দশক ধরে তিনি রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ের রাইফেল শুটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। শুটিংয়ে তার দক্ষতার জন্য তিনি ‘রেনাউন্ড শট’ বা ‘খ্যাতিমান শুটার’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন। পাশাপাশি ঘটনাচক্রে ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। তবে এসব কাজের বাইরে ঘরোয়া নানা ছিলেন যেন সাধারণ এক মানুষ। যিনি ঘর ও নিজের কাজ স্বাচ্ছন্দ্যেই করতেন।
বিশেষ করে রান্নায় পারদর্শী ছিলেন নানা পাটেকর। ভীষণ ভালোবাসতেন রান্না করতে এবং মানুষকে খাওয়াতে। এমনকি নানা মনে করতেন, তিনি অভিনয়ের চেয়েও রান্নায় বেশি ভালো করেন।
নানা পাটেকরের মানবিক কর্মকাণ্ডের কথাও বহুবার সামনে এসেছে। মহারাষ্ট্রের লাতুরের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে দুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা, বন্যাকবলিতদের জন্য ত্রাণ-বিভিন্ন সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘নাম ফাউন্ডেশন’ও কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে কাজ করে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নানা পাটেকর নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন। এমনকি শোনা যায়, তার আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই বিভিন্নভাবে দান করে দিতেন তিনি। অর্থ-সম্পদের প্রতি অনুরাগের বদলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোতেই যেন বেশি তৃপ্তি খুঁজে নিতেন এই অভিনেতা।
এদিকে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকর বলেছিলেন, ‘রান্না আমার আরেকটি শখ। মানুষকে খাওয়াতে আমার খুব ভালো লাগে। আমার মনে হয়, আমি অভিনেতার চেয়ে ভালো রাঁধুনি।’
২০১১ সালে ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের শুটিংয়ে আসার গল্প জানিয়েছিলেন নানা। তিনি বলেন, শুটিং প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি প্রায়ই প্রধান অতিথি হিসেবে যেতেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বন্দুক দিয়ে গুলি চালানোর সুযোগ পেতেন। ধীরে ধীরে তার নিশানা আরও ভালো হতে থাকে। একসময় তিনি মিনারেল ওয়াটারের বোতলের ছোট ক্যাপের মতো ক্ষুদ্র লক্ষ্যবস্তুতেও নিখুঁতভাবে গুলি করতে শুরু করেন।
২০০১ সালের দিকে, ৪৯ বছর বয়সে তিনি প্রতিযোগিতামূলক শুটিংয়ে অংশ নেওয়া শুরু করেন। ৫০ মিটার রাইফেল প্রোন এবং ৩০০ মিটার বিগ-বোর ইভেন্টে প্রতিযোগিতা করতেন তিনি। পুনের বালেওয়াড়ি ও মধ্যপ্রদেশের মহুর মতো বিভিন্ন শুটিং রেঞ্জে নিয়মিত অনুশীলন করতেন।
১৯৯১ সালের ‘প্রহার’ ছবির জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও শুটিংয়ে তাকে সাহায্য করেছিল। ২০০৪ সালে ইন্দোরের বিএসএফের রেওতি রেঞ্জে অনুষ্ঠিত ৪৮তম জাতীয় শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৩০০ মিটার বিগ-বোর ইভেন্টে রুপার পদক জেতেন নানা পাটেকর। এর তিন বছর পর, ২০০৭ সালে একই প্রতিযোগিতায় মহারাষ্ট্রের হয়ে দলগতভাবে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন তিনি। ৬০০-এর মধ্যে ৫৪৯ পয়েন্ট নিয়ে ৪৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ১৩তম হয়েছিলেন নানা।
২০০৭ সালের এই পারফরম্যান্সের পর তাকে ‘রেনাউন্ড শট’ বা ‘খ্যাতিমান শুটার’ উপাধি দেয় ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া। এই স্বীকৃতির ফলে তিনি শুল্ক ছাড়াই একটি রাইফেল আমদানি করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
নানা পাটেকর ৬০-এর দশকেও জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের শুটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। এরপরও শখের বশে নিয়মিত শুটিং করতেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় শুটিং রেঞ্জের কাছে শুটিংয়ের সুযোগ পেলে তিনি নিজের সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে যেতেন।
শুটিংয়ের জগতে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করা নানা পাটেকরের এই পথচলার শেষ হলো বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর)। গোয়ার ডোনা পাওলার বাড়িতে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি। ভারতীয় সময় ভোর ৫টা ২০ মিনিটে ৭৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স